কুতুবউদ্দিন আইবক এর কৃতিত্ব। Qutb Uddin Aibak in Bengali

WhatsApp Group (Join Now) Join Now
Telegram Group (Join Now) Join Now
4.3/5 - (6 votes)

আজ এই আর্টিকেলের মাধ্যমে দাস বংশের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দিন আইবক এর কৃতিত্ব আলোচনা করবো। তিনি ইতিহাসের পাতায় তুর্কি শাসনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বেশি বিবেচিত হন।

কুতুব উদ্দিন আইবক দিল্লীর সিংহাসন আরোহণের পর দিল্লি ও লাহোরকে স্বাধীন রাখার জন্য মধ্য এশিয়ার রাজনীতি থেকে তার সাম্রাজ্যকে দূরে রাখে।

বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে তিনি তুর্কি রাজন্যবর্গকে তার অধীনে আনতে পেরেছিলেন। সামরিক বাহিনীর সহযোগীতায় তার স্বল্প মেয়াদে তিনি সুষ্ঠু প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সচেষ্ঠ হয়েছিলেন।

প্রথম জীবন ভারত জয়ের ভূমিকা

এক নজরে

কুতুব- উদ্দিন ছিলেন তুর্কী। বাল্যাবস্থায় তিনি ভাগ্যচক্রে ক্রীতদাসে পরিণত হন এবং তুর্কীস্থান হইতে পারস্যে আনীত হন। নানা ভাগ্য বিপর্যয়ের পর অবশেষে তিনি মহম্মদ ঘুরীর নিকট বিক্রীত হন ।

এই সময়ে তিনি স্বীয় দক্ষতা প্রমাণ করিবার সুযোগ লাভ করেন এবং অল্প কালের মধ্যেই মহম্মদ ঘুরীর একান্ত বিশ্বস্ত অনুচর ও সেনাপতি পদে উন্নীত হন।

ভারত অভিযানে তিনি ছিলেন তাঁহার প্রধান সহায়ক । তরাইনের যুদ্ধের পর তিনি ভারতে মুসলমান বিজিত রাজ্যাংশের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন এবং অল্পকালের মধ্যে উত্তর ভারতের এক বিস্তীর্ণ অংশে তুর্কী আধিপত্য স্থাপন করেন ।

কুতুবউদ্দিন আইবকের উত্তর ভারত জয়

দিল্লি সালতানাত অঞ্চলগুলিকে কুতুব উদ্দিন আইবক তার সাম্রাজ্যের অংশ করার জন্য তিনি সামরিক অভিযান শুরু করেন। আইবকের সামরিক বাহিনী স্থানীয় রাজপুত রাজ্যকে পরাজিত করে সুলতান সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসে। যা কুতুব উদ্দিন আইবককে উত্তর ভারতে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে উল্লেখযোগ্য ভাবে সাহায্য করে।

রাজপুত রাজ্যের পরাজয়

রাজপুত সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কুতুব উদ্দিন আইবকের সফলতা তার সামরিক শক্তির দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। শক্তিশালী রাজপুত যোদ্ধাদের পরাস্ত করার জন্য তার অশ্বারোহী এবং যুদ্ধ কৌশল ছিল অনবদ্ধ । পৃথ্বীরাজ চৌহানের মতো শক্তিশালী হিন্দু রাজপুত শাসকদের পরাজয় তার সাম্রাজ্যকে মজবুত করেছিল।

দিল্লীর প্রথম সুলতান

অপুত্রক অবস্থায় ১২০৬ খ্রীষ্টাব্দে মহম্মদ ঘুরীর মৃত্যু হইলে, তিনি লাহোরে আমীর ও সেনাপতিদের সমর্থনে ‘মালিক’ উপাধি ধারণ করিয়া দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। এই সময় হইতে দিল্লীর সুলতানি সাম্রাজ্যের পত্তন হয়। 

 কুতুব-উদ্দিনই হইলেন তাহার প্রতিষ্ঠাতা। সিংহাসনে আরোহণ করিয়াই তিনি মহম্মদ ঘুরীর অন্যান্য অনুচরগণের সহিত বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করিলেন এবং নিজ অধিকার সুরক্ষিত করিবার জন্য সচেষ্ট হইলেন।

গজনী দখলের ব্যর্থ চেষ্টা সম্পূর্ণ ভারতীয় সুলতানে পরিণত

তিনি একবার তাজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে গজনী আক্রমণ করিয়া সাময়িক সাফল্য লাভও করিয়াছিলেন; কিন্তু তাহাতে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হওয়ার ফলে কুতুব উদ্দিন সম্পূর্ণ ভারতীয় সুলতানে পরিণত হইলেন । তিনি মাত্র চারি বৎসর রাজত্ব করিয়া ১২১০ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যুমুখে পতিত হন ।

🔥আরও পড়ুনঃ-

👉 মারাঠা শক্তির উত্থান

কুতুবউদ্দিন আইবক এর কৃতিত্ব:

নূতন রাজ্য জয়ে ব্যর্থতা সামরিক শাসন

স্বাধীন সুলতান হিসাবে কুতুব-উদ্দিন নূতন কোন রাজ্য জয় করিতে পারেন নাই ; মহম্মদ ঘুরীর অন্যান্য অনুচরদের সহিত বিবাদ বিসম্বাদেই তাহার বেশীর ভাগ সময় অতিবাহিত হইয়াছিল। শাসন সংক্রান্ত ব্যাপারেও তিনি নূতন কোন সংস্কার প্রবর্তন করিতে পারেন নাই।

স্থানীয় শাসন ভার স্থানীয় কর্মচারীদের উপরই ন্যস্ত ছিল; পূর্ববর্তী রাজস্ব ব্যবস্থাও অক্ষুণ্ণ ছিল। তাঁহার শাসনের ভিত্তি ছিল সামরিক শক্তি। প্রদেশে মুসলমান রাজকর্মচারিগণ সেনাধ্যক্ষ ও কাজীর সাহায্যে শাসন কার্য নির্বাহ করিতেন।

একজন শ্রেষ্ঠ রণকুশলী হইলেও শাসক হিসাবে কুতুব- উদ্দিন কোন সংগঠনী প্রতিভার পরিচয় দিতে পারেন নাই। তবে ভারতে মুসলমান রাজ্য স্থাপন তাঁহার কৃতিত্ব।

কুতুব কমপ্লেক্স

কুতুব উদ্দিন আইবক দ্বারা নির্মিত কুতুব মিনার এবং কুওয়াত-উল-ইসলাম মসজিদ যা আজও বিস্ময়কর। এই দুটি স্থাপত্য আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে চলেছে।

এই স্থাপত্য দুটি দিল্লির কুতুব কমপ্লেক্সতে অবস্থিত, যা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে স্বীকৃত দিয়েছে। এটি দিল্লি সালতানাতের উন্নতিশীল স্থাপত্যের একটি প্রমাণ হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। এই দুটি স্থাপত্য সারা বিশ্বের পর্যটক এবং ঐতিহাসিকদের আকর্ষণ করে।

কুতুব মিনার

স্থাপত্য শৈলীর ক্ষেত্রে কুতুব উদ্দিন আইবেকের সবচেয়ে বড় এবং উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হল ১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দে কুতুব মিনার নির্মাণ। 73 মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট টাওয়ারটি রাজপুতদের উপর কুতুব উদ্দিন আইবেকের বাহিনীর বিজয়ের স্মরণে নির্মিত হয়েছিল।

এটির জটিল খোদাই এবং ইসলামিক স্থাপত্য শৈলী সেই সময়ের জাঁকজমকপূর্ন শিল্পের উৎকর্ষতার প্রমাণ হিসাবে এখনও দিল্লিতে দাঁড়িয়ে আছে।

কুওয়াত-উল-ইসলাম মসজিদ

কুতুব উদ্দিন আইবক কর্তৃক প্রবর্তিত আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য হল ১১৯২ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত কুওয়াত-উল-ইসলাম মসজিদ। কুতুব কমপ্লেক্সে অবস্থিত মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল তখনকার সময়ে ভেঙে ফেলা হিন্দু ও জৈন মন্দিরের উপকরণকে ব্যবহার করে। তাই মসজিদটি হিন্দু এবং ইসলামিক স্থাপত্যের সংমিশ্রণ প্রদর্শিত হয়।

কুতুব উদ্দিন আইবকের প্রশাসন ব্যবস্থা

কুতুব উদ্দিন আইবক দিল্লি সালতানাতকে মজবুত করার জন্য একটি দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন, তাই তিনি তার রাজ্যকে কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত করেন, আর প্রতিটি প্রদেশের জন্য বিশ্বস্ত আধিকারিকদের নিয়োগ করেন। এই আধিকারিকরা প্রদেশে গুলিকে সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করতো। এটি ছিল বিকেন্দ্রীভূত শাসন কাঠামো একটি রূপ।

নীতি ও সংস্কার

কুতুব উদ্দিন আইবক দিল্লি সালতানাতের সাম্রাজ্যকে সুষ্ঠভাবে চালোনার জন্য কতগুলি কার্যকারি নীতি ও সংস্কার প্রয়োগ করেন। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যকে সাফল্য করতে বাবসায়ীদেরকে উৎসাহিত করেন।

কৃষির উন্নয়নের স্বার্থে এবং কৃষকদের সুবিধার্থে তিনি কিছু ভূমি সংস্কারের প্রচলন করেন। তার প্রচেষ্টার মাধ্যমে দিল্লিতে একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতি এবং সুনিয়ন্ত্রিত সমাজের প্রতিষ্ঠা হয়।

বিদ্যোৎসাহী ও সাহিত্যানুরাগী ‘লক্ষ-দাতা’

কুতুব-উদ্দিন বিদ্যোৎসাহী ও সাহিত্যানুরাগী ছিলেন। হাসান নিজামী, ফাকুড়ি মুদি প্রমুখ পারসিক পণ্ডিতগণ তাঁহার রাজসভা অলঙ্কৃত করিতেন। ভারতে তিনি ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের জন্য কিছুটা চেষ্টা করিয়াছিলেন ; দিল্লী ও আজমীড়ে সেই উদ্দেশ্যে দুইটি মসজিদ নির্মিত হইয়াছিল। সমসাময়িক অনেক সাহিত্যে তাঁহাকে ন্যায় পরায়ণ শাসক ও সুবিচারক বলিয়া অভিহিত করা আছে ।

“He dispensed even-handed justice to the people and exerted himself to promote the peace and prosperity of the realm.”-Hasan-un-Nezami (Vide, An Advanced History of India)

মিনহাজ-উস্-সিরাজের বর্ণনায় তাঁহার সদাশয়তার উল্লেখ আছে । তাঁহার দানশীলতার জন্য তিনি ‘লাখ-বথস্’ বা লক্ষদাতা উপাধিতে ভূষিত হইয়াছেন।

ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা

কুতুব উদ্দিন আইবক একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। তিনি তার রাজ্য জুড়ে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার আমলে মধ্যভারতে সবথেকে বড় মসজিদ নির্মাণ হয়।

তিনি বেশ কিছু মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন, যেখানে ইসলামিক শিক্ষা দেওয়া হত। আইবক ইসলামি পন্ডিত ও আধ্যাত্মিকদের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ইসলামী জ্ঞানের বিস্তার এবং সমৃদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।

উপসংহার

উপরে কুতুব উদ্দিন আইবকের কৃতিত্ব আলোচনা করে এটা বলা যায় যে তিনি ছিলেন এক জন দক্ষ শাসক। একদিকে তিনি ছিলেন এক জন অভিজ্ঞ সামরিক নেতা এবং অপরদিকে তার প্রশাসনিক, শিল্প ও স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষকতা তাকে এক অন্য মানুষে রূপান্তর করেছিল। তার ক্ষমতায় উত্থান মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে চিহ্নিত করে।

তার কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং সু-শাসন, কুতুব উদ্দিন আইবকে একটি শক্তিশালী বংশের ভিত্তি স্থাপন করেতে সাহায্য করে ছিল। স্থাপত্য এবং সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান প্রশংসনীয় এবং তার পরবর্তী শাসকদেরকে অনুপ্রাণিত করে। তার গুণগুলি তাকে ভারতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

FAQs কুতুব উদ্দিন আইবক

প্রশ্ন: কুতুবউদ্দিন আইবক কোন মসজিদ নির্মাণ করেন?

উত্তর: কুতুবউদ্দিন আইবক ভারতীয় উপমহাদেশে নির্মিত প্রথম মসজিদ কুওয়াত-উল-ইসলাম মসজিদ নির্মাণ করেন।

প্রশ্ন: সুলতান কুতুব উদ্দিন কোন খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন?

উত্তর: সুলতান কুতুব উদ্দিন ‘সুলতান’ উপাধিতে ভূষিত হন। যার অর্থ ইসলামিক রাজ্যের একজন শাসক বা নেতা।

প্রশ্ন: কুতুবউদ্দিন আইবক কার ক্রীতদাস ছিলেন?

উত্তর: কুতুবউদ্দিন আইবক মুইজ আল-দীনের ক্রীতদাস ছিলেন।

প্রশ্ন: কুতুবউদ্দিন আইবেক কে ছিলেন?

উত্তর: কুতুবউদ্দিন প্রথম জীবনে এক জন ক্রীতদাস ছিলেন,পরবর্তী কালে তিনি যোগ্যতার কারণে দিল্লির এক জন শাসক হয়েছিলেন।

প্রশ্ন: কুতুবউদ্দিন আইবেকের সেনাপতির নাম কি?

উত্তর: কুতুবউদ্দিন আইবেকের একজন বিশিষ্ট সেনাপতির নাম হল গিয়াসউদ্দিন বলবন।

প্রশ্ন: কুতুব মিনার কে নির্মাণ করেন?

উত্তর: কুতুবউদ্দিন আইবক 1199 খ্রিস্টাব্দে কুওয়াত-উল-ইসলাম মসজিদের পাশে কুতুব মিনারটির নির্মাণের কাজ শুরু করলেও তার উত্তরসূরি ইলতুৎমিশ 1220 খ্রিস্টাব্দে এই মিনারটির নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ করেন।

প্রশ্ন: সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেক কোন বংশের শাসক ছিলেন?

উত্তর: সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেক ছিলেন মামলুক বংশের শাসক, যেটি আবার দাস বংশ বা ক্রীতদাস রাজবংশ নামেও পরিচিত।

প্রশ্ন: কুতুব উদ্দিন নামের অর্থ কি?

উত্তর: কুতুব উদ্দিন একটি আরবি শব্দ যার অর্থ হল ধর্মের মেরুদন্ড। যেটি মূলত ইসলাম ধর্মকে নির্দেশ করে। যেখানে কুতুব শব্দের অর্থ অক্ষ বা মেরু এবং উদ্দিন শব্দের অর্থ হল বিশ্বাসের বা ধর্মের।

Hey, My Name is Priyanka From Diamond Harbour, West Bengal & I Have Been Blogging Since 3 Years Ago. I Have 10+ Websites Which I Manage by Myself. I completed my graduation in philosophy.

Leave a Comment